Home News কঠিন সময়ের কল্প বিশ্বাস

কঠিন সময়ের কল্প বিশ্বাস

by Afonso
0 comment
Rate this post

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রকৃতি পর্বের এই গানে এভাবে বৈশাখের আবাহন করেছিলেন, যা পয়লা বৈশাখে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে প্রতি বছর অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন। সে কারণে সবার কাছে কম-বেশি পরিচিত। কেন জানি, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনটিতে এই লাইন দুটো দিয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা ও শুভকামনায় ভাসিয়ে লেখাটা শুরু করার ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হলেই তো হলো না, বাস্তবতা বলে একটা কথা আছে।

আসলেই ২০২৪ সালটা কেমন যাবে? সবজান্তা সমশের ভেবে কেউ কেউ আমাকে এ প্রশ্ন করেন। আমি নিরুত্তর। কারণ, আমার কাছেই বিষয়টা পরিষ্কার না। আবার যদি হতাশার কথা বলি, তাহলে তিনি নিরাশ হবেন। এত না-পাওয়ার মধ্যে আর নতুন করে কাউকে হতাশার সাগরে ফেলতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু আশাবাদী হব, এমন সাহসও যে পাই না। সব মিলিয়ে সুন্দরের খোঁজে কেমন জানি এক অদ্ভুত আঁধারে হাতড়ে বেড়াতে হচ্ছে।

আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৭ জানুয়ারি। সবার অংশগ্রহণ না হওয়া সত্ত্বেও হিংসার ব্যাপ্তিতে পিছিয়ে নেই এর প্রচার। শারীরিক নিগ্রহের পাশাপাশি পারিষদ-দলের মুখের ভাষা মারে আরও শতগুণ। যারা জনকল্যাণের লক্ষ্যে নির্বাচিত হতে মাঠে নেমেছেন, তাঁদের উঠে আসার ছবিটাই যদি এমন হয় এবং নির্বাচনের আগেই যদি প্রতিপক্ষের প্রতি ক্ষমতার দাপট দেখানো চলতে থাকে, তাহলে প্রকৃত ক্ষমতা হাতে পেলে না জানি কী হয়। আদপে সে কথা ভাবলে আশ্বস্ত হওয়ার সুযোগ খুবই কম। আর এটাই তো বছরের শেষ নির্বাচন না, দিন গড়ালে আরও আসবে। আপাতত সে আলোচনা উহ্যই থাকুক।

কিন্তু আমরা কি এভাবে ভালো থাকতে পারব? বিশ্বজুড়ে আমাদের বন্ধুরা যদি ভালো না থাকে, তাহলেও আমরা যেমন ভালো থাকব না; তেমনি তারা যদি ভালো থাকতে না দেয়, তাহলেও আমাদের পক্ষে খারাপ থাকা ঠেকিয়ে রাখা অনেক কঠিন। এই ভুবনগ্রামে এখন আর কারও পক্ষে নিঃসঙ্গ বা একাকী চলা সম্ভব না। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোকে বাদ দিয়েও যদি ১৯৯০-উত্তর পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনের কথা বলি, তাহলে তা গত ৩২-৩৩ বছরে আমাদের এই ব্যবস্থা শুধু শেখায়নি, অভ্যস্ত করে তুলেছে। এই দেখুন ২০২২-এর ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া হামলা চালাল ইউক্রেনে, আর কিনা সাথে সাথে আগুন লাগল আমাদের পণ্যের হাটে। আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল, চিনিসহ আরও অনেক পণ্য বাজারে যেভাবে দামের পাল্লা দেওয়া শুরু করল, তাতে বোঝা কঠিন ছিল—যুদ্ধটা ঠিক কোথায় বেধেছে।

ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ভবন। ছবি: রয়টার্সএকইভাবে গাজায় আগ্রাসী ইসরায়েলকে থামাতে লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালাচ্ছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। এতে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে ঘুরপথে চলতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে খরচ। আর সেই খরচ শেষমেষ জোগাতে হবে আমাদের। এত কিছুর পর এই তো বেশ আছি–এ কথা বলার মতো দেশ হাতে গুণে কটা পাওয়া যাবে বলা কঠিন। ফলে অগ্নিস্নানে ধরার শুচি হওয়া আপাতত দিবাস্বপ্নেই থাক।

আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সপ্তাহখানেক পর ১৩ জানুয়ারি তাইওয়ানে নির্বাচন। চীনের কাছে বিষয়টি প্রচণ্ড স্পর্শকাতর। আমেরিকার আপত্তি সত্ত্বেও শি জিনপিং-এর সরকার এ ব্যাপারে খুল্লাম খুল্লা। কোনো রাখঢাক নেই। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শি বলেছেন, চীনের মূল খণ্ডের সঙ্গে তাইওয়ানের পুনরেকত্রীকরণ অনিবার্য।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ফাইল ছবিচীনা বরাবরই শান্তিপূর্ণভাবে তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছে। যেমনটা হংকং-এর ক্ষেত্রে হয়েছে। হংকং-এ ইউনিয়ন জ্যাক নামানো যতটা সহজ হয়েছে, তাইওয়ানে সেটা খাটছে না। কারণ আমেরিকা। এই একটি বিষয়ে দুই পরাশক্তি একেবারে দুই মেরুতে। ফলে ১৩ জানুয়ারির পর তাইওয়ানকে ঘিরে এই দুই দেশ কী ভূমিকা নেবে, তার ওপর নির্ভর করছে আমাদের আগামী দিনের পথচলা। চীন ইতিমধ্যে প্রতিবেশী এই দ্বীপটি ঘিরে সঙিন উঁচিয়ে আছে। ‘চীন অনন্তকাল অপেক্ষা করতে পারবে না’–প্রেসিডেন্ট শির এই কথায় যদি লালবাহিনী অগ্রগামী হয়, তাহলে ওয়াশিংটন বসে থাকবে—এমন ভাবাটা বোকামি।

সবার কাছে এটা এখন পরিষ্কার যে, ইউক্রেনের যুদ্ধ আসলে আমেরিকার যুদ্ধ। দ্বিতীয় কোনো দেশকে দিয়ে সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশটিকে যদি ঘায়েল করা যায় তো মন্দ কী? অবিভক্ত ভারতে ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের ত্রিপুরি সম্মেলনে সভাপতি পদে সুভাষ চন্দ্র বসুর কাছে হেরেছিলেন মহাত্মা গান্ধীর নিজের প্রার্থী পট্টাভি সীতারামাইয়া। এটা মানতে পারেননি গান্ধীজি। বলেছিলেন, ‘সীতারামাইয়ার পরাজয় মানে আমার পরাজয়।’ গান্ধীজির এই পক্ষ নেওয়ার কষ্টে কংগ্রেসই ছেড়েছিলেন সুভাষ বসু। সে এক অন্য গল্প। এখানে অন্ত্যঃমিল হলো, ইসরায়েলে হামাসের হামলা নিতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। প্রথম দিন থেকে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো সমর্থন দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন এ লড়াই আসলে ইসরায়েলের না, আমেরিকার। ইসরায়েলকে অন্ধ সমর্থনের ব্যাপারে সব মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ছাড়িয়ে গেছেন বাইডেন। বারো শ প্রাণের বিনিময়হার ২০ হাজার না ২০ লাখ হবে, তা ঠিক করার একান্ত অধিকার ইসরায়েলের–এটাই হয়তো বাইডেন সাহেবের মত।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। ফাইল ছবিতাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াল? আমেরিকা ২০২২ সালে ইউক্রেনে একটা যুদ্ধ শুরু করেছে, যা এখনো চলমান। ২০২৩-এর শেষের দিকে আরেকটা শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্যে। এটা শেষ হওয়া দূরস্থান আরও কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, তা নিয়েই চলছে নানা জল্পনা–কল্পনা। আর ২০২৪-এ আশঙ্কা দূর প্রাচ্যে (পড়ুন চীনে) এমন ঘটতে পারে। কেমন জানি গুলিয়ে যাচ্ছে সব। গুলাবে না-ই বা কেন? তারপরও চলুন অতীতটা একটু দেখে নেওয়া যাক।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কফিনে শেষ পেরেকটা পোতার পর থেকেই আমেরিকা এই দুনিয়ার একক অধীশ্বর। এত দিন তারা যা বলেছে, তাই হয়েছে। বিনা প্রশ্নে, বিনা বাধায় আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে একপাক্ষীয় যুদ্ধ চলেছে। কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি। আইএসআইএস-এর নাম করে সিরিয়া দখল করতে গিয়ে তারা প্রথম বাধা পায় রাশিয়া, ইরান ও চীনের কাছ থেকে। ওই প্রথম তারা বুঝতে পারে, ১৯৯১ সালে কফিনে পেরেক পোতার পর আরও কিছু কাজ বাকি ছিল, যা এখনই করতে হবে। এই কাজটি হলো প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থাকে আবার নতুন করে এবং অতি অবশ্যই নিজেদের মতো করে ঢেলে সাজানো।

১৯৯০ সালে প্রথম ইরাক যুদ্ধের আগে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ সে দেশের কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমেরিকা সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা অনুসরণ করবে।’ এখনো তাদের মতো করে তেমনটাই তো চলছে। তাহলে হঠাৎ কী হলো?

আসলে চলেছে না। ওই যে বললাম, সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে না হটাতে পারাটা মানতেই পারেনি আমেরিকা। সোভিয়েত-কালের সামরিক জোট ওয়ারশ ভাঙার পর ক্রমাগত ন্যাটোর সদস্য বৃদ্ধি নিয়ে রাশিয়ার ক্ষোভকেও কখনো গ্রাহ্য করেনি আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা। ১৯৯০-এ ওয়ারশ জোট ভেঙে দেওয়ার পর কথা ছিল ন্যাটোকে আর বাড়ানো হবে না। কিন্তু সে কথা রাখেনি তারা। গত ৩০ বছরে বিলুপ্ত ওয়ারশ জোটের অন্তত ১০টি দেশকে ন্যাটোর সদস্য করা হয়েছে, যা মানতে পারেনি পুতিনের রাশিয়া। এ জন্য প্রতিবেশী জর্জিয়ায় হামলা চালিয়ে ন্যাটো জোটকে শিক্ষা দিয়েছিল মস্কো। একই কাজ ন্যাটো করেছে ইউক্রেনের সাথে। অনেকটা তারই ফল বর্তমান যুদ্ধ। কারণ, রাশিয়া কখনোই চায়নি ন্যাটো তার সদর দরজার সামনে এসে অপেক্ষায় থাকুক।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবিকিন্তু আমেরিকা গত ৫০ বছরে সবচেয়ে বোকা বনেছে চীনকে ‘মোস্ট ফেভারড নেশনের’ মর্যাদা দিয়ে এবং সেখানে অঢেল বিনিয়োগ করে। আমেরিকার চিন্তকদের ধারণা ছিল, পুঁজির দাপটে চীনের কমিউনিস্ট শাসনের বজ্র আঁটুনি ক্রমশ ফসকা হয়ে আসবে। তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ঘটনার পর এটাই ছিল চীনের জন্য দাওয়াই। কিন্তু ঘটল পুরো উল্টো। চীন নিজ দেশে কমিউনিস্ট শাসন আরও পাকাপোক্ত করে অর্থনীতিতে ফুলেফেঁপে উঠল। অর্থনীতির পাশাপাশি প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিল তারা। এখনো অবশ্যই সামরিক সক্ষমতায় আমেরিকার চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও চীন কিন্তু অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। আমেরিকা যখন বিশ্বজুড়ে সুমদ্রপথের ওপর সামরিক আধিপত্য কায়েমের মাধ্যমে নিজস্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা পাকা করেছে, তখন চীন তলেতলে এগিয়েছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামের ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক প্রকল্প নিয়ে। এখন দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ-শক্তিকে ক্রমাগত সংহত করছে দেশটি। ইসরায়েলে হামাসের হামলার পরপরই ভূমধ্যসাগরে আমেরিকা দুটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর সাথে সাথে চীন ওই এলাকায় দুটো যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছে। অর্থাৎ, এটা বোঝানো যে বৈশ্বিক নৌ-শক্তিতে বেইজিং কারও চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই।

চীনের বিষয়টি এমনভাবে বুমেরাং হবে, তা বোধহয় মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি। আর আমেরিকা যে গোপনে হলেও তার বৈশ্বিক নীতি বা অ্যাজেন্ডা পাল্টাতে চলেছে, যার প্রধান লক্ষ্য এই দুই দেশ– এটা রাশিয়া ও চীন আগেই টের পেয়েছিল। যার প্রমাণ মেলে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অধিবেশনে (২০১৮ সালে) শি জিনপিং-কে আজীবনের জন্য চেয়ারম্যান রাখার সিদ্ধান্ত। একই সাথে দুবারের পর আর প্রেসিডেন্ট হওয়া যাবে না– রুশ সংবিধানের এই ধারা বাতিল করে (২০২০ সালে) আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকার পথ পোক্ত করেন পুতিন। দেশ দুটি বুঝেছিল, আমেরিকা ও তার মিত্রদের সাথে সমানে সমানে খেলতে হলে শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা আশঙ্কা থাকলে চলবে না।

বিশ্বে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে আমেরিকার বৈশ্বিক নীতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সেই বারাক ওবামার আমলে নেওয়া। মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) নীতি এসব কিছুকে তলে ফেলে দিয়েছিল। যাকে আবার চাগিয়ে তুলেছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান গত এপ্রিলে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনে দেওয়া এক বক্তব্যে স্পষ্ট করে দেন যে, ‘শেষ পর্যন্ত, আমরা একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে যাচ্ছি। তা অনেকগুলো স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, যেমনটা আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে করেছিলাম।’ এর অর্থ ৭৫ বছরের পুরোনো আর্থিক কাঠামোটা আর কাজে আসছে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর বক্তব্য, সুলিভানদের ভয় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে চীন এমন জায়গায় না চলে যায় যে, আবার একটা শীতল যুদ্ধের হ্যাপা সামলাতে হয় তাদের।  

গত ২৩ সেপ্টেম্বর জন হপকিন্স স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভান্স স্টাডিজে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন কী বলেছেন শুনুন: ‘একটি যুগ শেষ হচ্ছে, আরেকটি নতুন যুগ শুরু হতে যাচ্ছে এবং আমরা এখন যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, তা আগামী কয়েক দশকের জন্য ভবিষ্যতের রূপ দেবে।’ বিশ্লেষক মোহাম্মাদ হাসান সেওইদানের মতে, এই শব্দগুলোর মাধ্যমে ব্লিঙ্কেন আমেরিকান যুগের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা এক বিশ্বব্যবস্থা থেকে অন্য বিশ্বব্যবস্থায় রূপান্তর হতে চলেছে।

এর মাসখানেক পর সুলিভান ও ব্লিঙ্কেনের বস প্রেসিডেন্ট বাইডেন হোয়াইট হাউসে এক আলাপে জানালেন, ‘একটি ব্যবস্থা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ৫০ বছর ধরে ভালোভাবে কাজ করেছে। সেখানে বাষ্প-শক্তি শেষ হয়ে গেছে। এখন একটি নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজন।’ তাঁর স্বপ্ন, ‘(আমেরিকানদের) কিছু করার সুযোগ আছে, যদি তারা যথেষ্ট সাহসী হয় এবং নিজেদের ওপর যথেষ্ট আস্থা রাখে বিশ্বকে এমনভাবে একত্রিত করার, যা আগে কখনো হয়নি।’

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা! যার বাস্তবায়নে রাশিয়া, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়াসহ সব বেয়াড়া দেশকে উচিত শিক্ষা দেওয়া, যাতে তারা আরও দীর্ঘকাল ‘জো হুজুরের’ দলেই থাকে। তবে তেমনটা হওয়া কঠিন। বাইডেনের কথার জবাব দ্রুত এসেছে মস্কো থেকে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থার’ প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত। তবে এটা যে আমেরিকার নেতৃত্বে থাকা উচিত, এতে বিশ্বাস করেন না। এমনটা আসলে আর হবে না। ক্রেমলিনের এই মনোভাবের সাথে কিন্তু ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা বা জার্মানির অমিল নেই। তারা সবাই নিজেকে বিশ্বসভায় গুরুত্বপূর্ণ আসনে দেখতে চায়। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে। অর্থাৎ, ভেটো দেওয়ার অধিকার চায়। অন্যদিকে সৌদি আরব, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় পারমাণবিক বোমার অধিকারী হতে চায়, সেটা গোপনে হলেও। কারণ, আমেরিকার নিরাপত্তা ছায়াতলে তারা আর স্বস্তি পাচ্ছে না। বরং এই অস্ত্রই আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচানোর বা বিশ্বসভায় সমীহ অর্জনের একমাত্র পথ, এটা ধনাঢ্য দেশগুলো তা ভালোই বুঝেছে। ফলে দুনিয়া আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জায়গায় নেই যে, চাইলেই আমেরিকা ও তার মিত্ররা একটা সর্বজনীন বৈশ্বিক নীতি বাজারে চালিয়ে দেবে।

সংঘাতের শুরু আসলে এই জায়গা থেকেই। নতুন এই বৈশ্বিক পরিকল্পনায় রাশিয়া এত বড় দেশ হিসেবে থাকবে কি-না; চীনের সম্প্রসারণ ও আধিপত্যে আচ্ছামতো লাগাম পরানো; ইরানকে পঙ্গু করে মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুদের চিরস্থায়ী নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া; পাশাপাশি ইসরায়েলকে নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পাওয়া– কত কিছুই না থাকতে পারে। আর এত বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেক সময় তো অছিলা লাগেই। কে জানে ইউক্রেন, হামাস, হুতি, তাইওয়ান–এর সবই সেই অছিলা কি-না?

মার্ক জাকারবার্গ ও ইলন মাস্ক। ফাইল ছবিএকটু অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। টুইটারে (বর্তমানে এক্স) পাওয়া। এর সত্যতা নেটে সার্চ দিলেই মিলবে। ফেসবুক, থুড়ি মেটা-র মালিক মার্ক জাকারবার্গ বিলিওনিয়ার বা শত কোটিপতি হয়েছেন কবে জানেন? সেই ২০০৮ সালে। তারপর ১৫টা বছর কেটে গেছে। কিন্তু তাঁর মাথায় এ ভাবনা আসেনি। হঠাৎ ২০২৩ সালে এসে তিনি এক বিরাট সমৃদ্ধ বাঙ্কার বানিয়েছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রজন্ম ছাড়া তেমন কেউ বাঙ্কারের সাথে পরিচিত না। সেটা সৌভাগ্যই বটে। তবে নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে যুক্ত সবাই মাটির নিচে বাঙ্কারের সাথে পরিচিত। আর সর্বশেষ ইসরায়েল যেভাবে হামাসের বাঙ্কার নিয়ে মারমুখী হয়েছে, তাতে আর কারও কাছে অন্তত শব্দটি অপরিচিত না।

আমেরিকার ধনকুবেরদের অধিকাংশ এমন সুরক্ষিত বাঙ্কারের অধিকারী। এই বাঙ্কার তাঁদের বিলাসিতা নয়, নিরাপত্তার গ্যারান্টি। বিশ্বে কখনো পারমাণবিক যুদ্ধ বাধলে সপরিবারে, সপার্ষদ এখানে আশ্রয় নেবেন তাঁরা। অর্থাৎ ওই যুদ্ধে কোটি কোটি উলুখাগড়ার প্রাণ গেলেও তাঁরা ঠিকই টিকে থাকবেন শ্মশান-ভূমে নতুন ফুল ফোটাতে! হাওয়াইতে দেড় হাজার একর জমির ওপর জাকারবার্গের যে বাড়ি, সেখানেই এই সুরক্ষিত বাঙ্কার তৈরি করা হয়েছে। ইন্টারনেটে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সেখানে ন্যূনতম ৩০টি ঘর ও ৩০টি বাথরুম আছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোয়াইট হাউসসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় এ ধরনের বাঙ্কার করা আছে।

মার্ক জুগারবার্গ। ফাইল ছবিফলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি সুরক্ষিত বাঙ্কার কোনো নতুন বিষয় নয়। আর জাকারবার্গ তা করতেই পারেন। কারণ, তাঁর অঢেল টাকা। প্রশ্ন হলো—২০২৩-এ এসে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? এর মধ্যে কী কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে? মনে রাখা দরকার, আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের মুখোমুখি যারা দাঁড়িয়েছে, সেই রাশিয়া, চীন, ইরান সবাই পারমাণবিক অস্ত্রধর দেশ। সেটা স্বীকৃত হোক বা না হোক। এর বাইরে ইসরায়েল, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া এ মারণাস্ত্রে বলীয়ান। ফলে সংঘাত বাধলে কে কোথায় কী ব্যবহার করবে আগাম বলা কঠিন।

আর একটা বিষয় লক্ষ্য করবেন, এই সংঘাতের নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের সবার বয়স ৭০-এর ওপরে। কেউ কেউ কিছুদিনের মধ্য অশীতিপর হবেন। ফলে এই নেতারা বিশ্ববাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা রাখেন, সেটাও বিরাট প্রশ্ন। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার মস্তিষ্কের ক্ষয় বাড়ে। কারও ক্ষেত্রে তা লয়ও হয়। তাই বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রাজ্ঞ বা বিজ্ঞজনের মাথায় অজ্ঞতা ভর করা, বিস্ময়ের কিছু না। ভয়টা আসলে সেখানে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক মর্মন্তুদ ঘটনার সাক্ষী কালজয়ী বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। বড় কোনো যুদ্ধের প্রসঙ্গ এলেই তাঁর একটা বক্তব্য বেশ প্রচার পায়। যেমন এখন পাচ্ছে। কথাটা হলো: ‘আমি জানি না, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোন অস্ত্র ব্যবহার হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ মানুষ লড়বে লাঠি আর পাথর দিয়ে।’ এই মহান বিজ্ঞানীর ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অমোঘ সত্য। আমরা চাই, সেই সত্য যেন চিরকালের জন্য ভুল প্রমাণিত হয়। আমরা সবাই জোর গলায় বলি, ‘… মহাকালসিংহাসনে/ সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,/ কণ্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী, শিশুঘাতী নারীঘাতী/ কুৎসিত বীভৎসা-’পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন/ নিত্যকাল রবে যা স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের/ হৃৎস্পন্দনে, রুদ্ধকণ্ঠ ভয়ার্ত এ শৃঙ্খলিত যুগ যবে/ নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে।’

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



source

You may also like

Leave a Comment